30/06/2026
অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৯-এ যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো। কর্পোরেট করদাতা, হিসাবরক্ষক এবং কর পেশাজীবীদের আইনি জটিলতা এড়াতে এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. জটিল বিবরণীর অবসান ও 'আয় পরিগণনাপত্র' [ধারা ১৬৯(২)(গ)]
আগের বিধান ও সমস্যা: আগে কোম্পানিগুলোকে ধারা ৪৯ থেকে ৫৫-এর অধীনে অনুমোদিত খরচ (Allowable Expenses) এবং অননুমোদিত খরচের (Disallowable Expenses) একটি বিশাল ও জটিল সমন্বয় বিবরণী ম্যানুয়ালি তৈরি করে রিটার্নের সাথে দিতে হতো। এতে প্রায়ই কর কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে হিসাবের অমিল এবং আইনি বিতর্কের সৃষ্টি হতো।
২০২৬ সালের বিস্তারিত আপডেট: নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, এই দীর্ঘ বিবরণীর আর প্রয়োজন নেই। এখন ধারা ৭৩ অনুযায়ী কোম্পানির অডিট সম্পন্নকারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) দ্বারা প্রত্যয়িত "আয় পরিগণনাপত্র" বা Tax Computation Sheet জমা দিলেই চলবে।
প্রভাব: এর ফলে রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া যেমন গতিশীল হবে, তেমনি কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অডিট রিপোর্টের আইনি গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত হবে।
২. উৎসে কর (TDS) রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক [ধারা ১৬৯(২)(ঘ)]
এটি এই অর্থ আইনের সবচেয়ে দূরগামী এবং কঠোর পরিবর্তন। কোম্পানিগুলোর জন্য এটি এখন ডাবল-চেক বা ক্রস-ভেরিফিকেশনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
বাধ্যবাধকতা: ধারা ১৭৭ অনুযায়ী প্রতিটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময় পরপর (সাধারণত কোয়ার্টারলি) উৎসে কর বা উইথহোল্ডিং ট্যাক্সের রিটার্ন জমা দিতে হয়। ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী, মূল বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই TDS রিটার্ন জমার প্রাপ্তি স্বীকার পত্র (Acknowledgement Receipt) সংযুক্ত করা শতভাগ বাধ্যতামূলক।
আইনি জটিলতা ও ফলাফল: আপনি যদি সারা বছর নিয়মিত TDS কেটে সরকারি কোষাগারে জমাও দিয়ে থাকেন, কিন্তু মূল রিটার্নের সাথে তার প্রাপ্তি স্বীকার পত্র না দেন, তবে আপনার মূল আয়কর রিটার্নটি "অসম্পূর্ণ" (Incomplete Return) বলে গণ্য হবে। আয়কর আইন অনুযায়ী, অসম্পূর্ণ রিটার্ন জমা দেওয়া আর রিটার্ন জমা না দেওয়া সমার্থক, যার ফলে কোম্পানি জরিমানা এবং অতিরিক্ত সরল সুদের (Simple Interest) মুখোমুখি হতে পারে।
উদ্দেশ্য: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চায় যে, কোনো কোম্পানি যেন কর ফাঁকি দিতে না পারে এবং উৎসে কর কর্তন ও বার্ষিক আয়ের হিসাব যেন শতভাগ মিলে যায়।
৩. ‘প্রধান কর্মকর্তা’ থেকে ‘মুখ্য কর্মকর্তা’ [ধারা ১৬৯(৫)(গ)]
আইনি শব্দচয়নের এই ছোট পরিবর্তনটি কর্পোরেট গভর্নেন্স বা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সংজ্ঞার স্পষ্টীকরণ: আগে "প্রধান কর্মকর্তা" বা Principal Officer শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হতো, যা অনেক সময় কিছুটা অস্পষ্ট ছিল। অনেক কোম্পানি আইনি ঝামেলা এড়াতে কোনো জুনিয়র ম্যানেজার বা সাধারণ অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তাকে দিয়ে রিটার্নে স্বাক্ষর করিয়ে নিত।
বর্তমান কড়াকড়ি: ২০২৬ সালের সংশোধনীতে এই শব্দ পরিবর্তন করে "মুখ্য কর্মকর্তা" (Chief Officer) করা হয়েছে। এর স্পষ্ট অর্থ হলো— কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO), অথবা প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (CFO)-র মতো শীর্ষ পদের অধিকারী ব্যক্তি।
আইনি দায়বদ্ধতা: রিটার্নে কোনো ভুল তথ্য, আয়ের গোপনীয়তা বা কর ফাঁকির প্রমাণ মিললে, এর জন্য চূড়ান্ত আইনি ও ফৌজদারি দায়বদ্ধতা (Criminal Liability) এখন সরাসরি সেই মুখ্য কর্মকর্তার ওপর বর্তাবে। কোনো অবস্থাতেই জুনিয়র স্টাফদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না।
টেক্স প্রফেশনাল ও কর্পোরেটদের জন্য পরামর্শ:
১. আগে থেকেই ডকুমেন্ট গুছিয়ে রাখুন: শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়াতে বছরের শুরু থেকেই প্রতি কোয়ার্টারের TDS রিটার্ন জমার একনলেজমেন্ট কপি (প্রাপ্তি স্বীকার পত্র) আলাদা ফাইলে সংগ্রহ করে রাখুন।
২. শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়ে রাখুন: কোম্পানির নতুন আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি এমডি (MD) বা সিইও (CEO)-কে আগে থেকেই জানান। কারণ রিটার্নে কোনো ভুল হলে আইনি দায় এখন সরাসরি তাদের (মুখ্য কর্মকর্তা) ওপর বর্তাবে।
৩. হিসাব ক্রস-চেক করুন: রিটার্ন জমার অন্তত ১৫ দিন আগেই কোম্পানির নিজস্ব হিসাবের সাথে অডিটরদের দেওয়া ট্যাক্স কম্পিউটেশন শিট এবং TDS জমার টাকার অংক শতভাগ মিলিয়ে নিন।