17/03/2026
নরওয়ে তেল খুঁজে পেল। তারপর এমন এক সিদ্ধান্ত নিল, যা বেশিরভাগ দেশ কখনও নিতে পারে না।
১৯৬৯ সালে, নরওয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ offshore তেলের ভাণ্ডার আবিষ্কার করে।
Ekofisk ফিল্ড সবকিছু বদলে দেয়।
হঠাৎ করেই, এই ছোট স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ অসাধারণ সম্পদের মালিক হয়ে যায়।
তারা চাইলে অন্য অনেক তেলসমৃদ্ধ দেশের মতো করতে পারত—
• সব টাকা একসাথে খরচ করে ফেলতে
• বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে
• অর্থনীতিতে বুদবুদ তৈরি করতে
• কয়েকজনকে ধনী করে, বাকিদের কষ্টে ফেলতে
এবং যখন তেল শেষ হয়ে যেত—
দেশ ডুবে যেত ঋণ আর অস্থিরতায়।
নাইজেরিয়া এইভাবে নিজেদের শেষ করেছে।
ভেনেজুয়েলা এইভাবে নিজেদের শেষ করেছে।
লিবিয়াও এইভাবে নিজেদের শেষ করেছে।
নরওয়ে এসব দেখে অন্য পথ বেছে নিল।
১৯৯০ সালে, নরওয়ের পার্লামেন্ট তৈরি করল Government Pension Fund Global।
নিয়মগুলো ছিল সহজ, কিন্তু বিপ্লবী—
তেল থেকে আসা সব লাভ এই ফান্ডে জমা হবে।
এই ফান্ড বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে।
নরওয়ে প্রতি বছর খুব অল্প অংশ তুলতে পারবে—প্রথমে ৪%, এখন ৩%।
বাকি টাকা থাকবে বিনিয়োগে—চিরকাল।
অনেকে ভেবেছিল, তারা পাগল।
যারা এখনও জন্মায়নি, তাদের জন্য টাকা জমিয়ে রাখবে কেন?
এখনই কর কমানো, বড় বড় প্রকল্প করা—এটাই তো স্বাভাবিক!
নরওয়ে বলেছিল—
কারণ ভবিষ্যতের নরওয়েজিয়ানরাও থাকবে,
এবং এই সম্পদের উপর তাদেরও সমান অধিকার আছে।
১৯৯৬ সালে, তারা প্রথম ১৫০ মিলিয়ন ডলার জমা করল।
তারপর তারা আরও অবিশ্বাস্য একটা কাজ করল—
তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকল।
• বছর বছর তেলের টাকা ফান্ডে জমা হলো
• বছর বছর বিশ্ববাজারে বিনিয়োগ চলল—শেয়ার, বন্ড, রিয়েল এস্টেটে, ৭০টিরও বেশি দেশে
• বছর বছর রাজনীতিবিদরা লোভ সামলে ফান্ডে হাত দেননি
প্রতিটি নির্বাচনে বেশি খরচের দাবি উঠেছে।
প্রতিটি অর্থনৈতিক সংকটে ফান্ড ব্যবহার করার চাপ এসেছে।
প্রতিটি বিপর্যয়ে বলা হয়েছে—“এই একবার নিয়ম ভাঙি।”
নরওয়ে প্রতিবারই বলেছে—না।
ফান্ড ম্যানেজাররা বাজারকে হারানোর চেষ্টা করেনি,
কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বাজিও ধরেনি—
তারা শুধু বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার কোম্পানিতে ছোট ছোট অংশ কিনে রেখেছে—আজ প্রায় ৯,০০০টি কোম্পানিতে।
তারা খেলেছে দীর্ঘমেয়াদি খেলা।
২০০০ সালে ফান্ডের মূল্য ছিল $৫০ বিলিয়ন।
২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় $৫০০ বিলিয়ন।
২০১৭ সালে তা ছাড়িয়ে যায় $১ ট্রিলিয়ন।
আজ তা $২ ট্রিলিয়নেরও বেশি।
মাত্র ৫.৬ মিলিয়ন মানুষের দেশে,
প্রতি নাগরিকের জন্য গড়ে প্রায় $৩৪০,০০০।
কিন্তু আসল চমক এখানে—
ফান্ডের অর্ধেকেরও বেশি মূল্য তেল থেকে নয়,
বিনিয়োগের রিটার্ন থেকে এসেছে।
এখন এই ফান্ড বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ থেকেই
নরওয়ের তেল-গ্যাস বিক্রির চেয়েও বেশি আয় করছে।
এই ফান্ড বিশ্বের প্রায় ১.৫% পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির মালিকানা রাখে।
Apple, Microsoft, Amazon—
এবং আরও হাজার হাজার কোম্পানিতে তাদের অংশ আছে।
আপনি যখন বড় কোনো কোম্পানির পণ্য কিনছেন,
তার একটা ছোট অংশ নরওয়ের ফান্ডে ফিরে যাচ্ছে।
৩% উত্তোলন নীতি নিশ্চিত করে—
এই ফান্ড কখনও শেষ হবে না।
এই ৩% দিয়েই নরওয়ের জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ চলে—
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, পেনশন—সব কিছু।
নরওয়ের তেল একদিন শেষ হবে—
৩০ বছর পর, হয়তো ৫০ বছর পর।
কিন্তু এখন সেটা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
শেষ তেলের ফোঁটা তোলার সময়,
নরওয়ের থাকবে বহু ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ড—
যা সারাজীবন আয় করে যাবে।
তারা সাময়িক তেল সম্পদকে
স্থায়ী আর্থিক সম্পদে রূপান্তর করেছে।
এই গল্পের আসল বুদ্ধিমত্তা তেল আবিষ্কারে নয়—
অনেক দেশই তেল পেয়েছে।
বুদ্ধিমত্তা ছিল এই সিদ্ধান্তে—
• প্রায় সবটাই সঞ্চয় করা
• বুদ্ধিমানের মতো বিনিয়োগ করা
• এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য চাপকে প্রতিহত করা
এর জন্য দরকার ছিল—
দূরদর্শিতা, শৃঙ্খলা, আর নম্রতা।
১৯৯৬ সালে শুরু হয়েছিল $১৫০ মিলিয়ন দিয়ে।
আজ তা $২ ট্রিলিয়নেরও বেশি—এবং বাড়ছেই।
৫০ বছর পর, যখন নরওয়ের তেলক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে যাবে—
• নরওয়ের শিশুরা ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে
• বৃদ্ধরা নিরাপদ অবসর জীবন পাবে
• পুরো দেশ সমৃদ্ধ থাকবে
—সবই সেই তেলের টাকায়, যা বহু বছর আগে শেষ হয়ে গেছে।
কারণ ১৯৯০ সালে,
নরওয়ে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—
তারা নিজেদের জন্য নয়,
তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য বেছে নিয়েছিল ভবিষ্যৎ।