24/01/2026
📌‘সুভাষচন্দ্র ও মুহম্মদ আলি জিন্নাহ’
✍️রানা চক্রবর্তী
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু চেয়েছিলেন যে, মুহম্মদ আলি জিন্নাহই স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হোন। বস্তুতঃ মুহম্মদ আলি জিন্নাহ যদি পাকিস্তান দাবির প্রস্তাব শিথিল করে অবিভক্ত ভারতের মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব কার্যকর করবার সিদ্ধান্তে রাজি হয়ে যেতেন—তাহলে হয়ত ভারত ভাগ হত না, এবং একইসাথে সুভাষচন্দ্রের দেশত্যাগ করবারও প্রয়োজন হত না। এরফলে মুহম্মদ আলি জিন্নাহই অখণ্ড স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় যে, সুভাষচন্দ্র নিজেই এই প্রস্তাব মুহম্মদ আলি জিন্নাহর কাছে, এবং একইসাথে জহরলাল নেহরুর কাছেও দিয়েছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ ও নেহরু—উভয়েই সুভাষচন্দ্রের এই প্রস্তাবে একমত হননি। আর শেষপর্যন্ত ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এবং নেহরু-জিন্নাহর মিলন অসম্ভব বুঝতে পেরেই সুভাষচন্দ্র দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত এক অনন্যোপায় সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বোম্বাইতে জিন্নাহর সঙ্গে শেষবার সাক্ষাৎ করে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মঞ্চে সামিল হওয়ার, এবং জিন্নাহকে দেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রীরূপে মেনে নেওয়ার যে প্রস্তাব করেছিলেন, আর জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই জওহরলালের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন—এই কাহিনী হল এক ঐতিহাসিক সত্যি। ভিন্নভাবে বললে, ভারতবর্ষের ইতিহাস একটা বাঁকের মুখে পৌঁছে কিভাবে ভিন্ন পথ গ্রহন করেছিল—এটা হল সেই ঐতিহাসিক কাহিনী।
সুভাষচন্দ্র তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সে সত্যটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, সেটা হল যে, ভারতের ভাগ্য এদেশের হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ওপরে নির্ভর করছে। বস্তুতঃ হিন্দু-মুসলমান ঐক্যকে সুভাষচন্দ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রধান গ্যারান্টি বলেই মনে করতেন। এখানে বলাই বাহুল্য যে, দেশবন্ধুর মানস-পুত্র হিসেবেই সুভাষচন্দ্রের মধ্যে এই মানসিকতা লালিত ও পালিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ একথাও স্মরণীয় যে, দেশবন্ধুর ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ প্রণয়নের পরিবেশেই সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল, এবং এই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমান ঐক্যই তাঁর কাছে সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। আসলে সুভাষচন্দ্র তখন যে নিষ্ঠুর এবং নির্মম সত্যকে মেনে নিয়েছিলেন, সেটা হল যে, ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের সিংহভাগই কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদে আস্থাশীল হতে পারেননি। একইসাথে তিনি ভালোভাবেই একথাও জানতেন যে, যদিও ইংরেজদের কূট-রাজনীতি এদেশে হিন্দু-মুসলমান বিভেদের ইন্ধন যুগিয়েছিল, কিন্তু তবুও মুসলিম লীগই তখন এদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের একটা বিরাট অংশের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছিল। আর এই বাস্তব সত্যকে মেনে নিয়েই সুভাষচন্দ্র তখন লীগের সঙ্গে একটা আপোষ, এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে এদেশের মুসলমান সম্প্রদায়েব মন জয় করবার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন। আর তাই হরিপুরা কংগ্রেস শেষ হওয়ার পরেই সুভাষচন্দ্র প্রথম যে কাজটা করেছিলেন, সেটা ছিল মিঃ জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ। ইতিহাস বলে যে, ১৯৩৮ সালের ১১ই মে তারিখে তাঁদের মধ্যে এই সাক্ষাৎকার ঘটেছিল, এবং এরপরে একনাগাড়ে চারদিন ধরে আলোচনা চলেছিল।
এসময়ে সুভাষচন্দ্র বসু বোম্বাইয়ের ২৬নং মেরিন ড্রাইভের একটি বাড়িতে, এবং মিঃ জিন্নাহ মালাবার হিলসে লিটল গিবস রোডের একটি বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। আর পর পর চারদিন তাঁদের মধ্যে আলোচনা চলবার পরে অবশেষে ১৪ই মে তারিখে জিন্নাহ-বসু প্রস্তাব বিনিময় হয়েছিল। তখন সুভাষচন্দ্র জিন্নাহর কাছে তাঁর প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন ১৪ই মে তারিখে, আর জিন্নাহ এর প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন ৬ই জুন তারিখে। এরপরে ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সুভাষ-জিন্নাহর মধ্যে পত্রালাপ ও প্রস্তাব বিনিময় চলেছিল। এর প্রথমদিকে জিন্নাহ সুভাষচন্দ্রকে মুসলিম লীগ একজিকিউটিভ কমিটির যে প্রস্তাবটি জানিয়েছিলেন, সেটা এরকম ছিল—
“মুসলিম লীগ ভারতের মুসলমানগণের প্রামাণিক ও প্রতিনিধিস্থানীয় সংগঠন—একমাত্র এই ভিত্তি ছাড়া কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম মীমাংসার প্রশ্ন লইয়া আলোচনা করা বা কংগ্রেসের নিকট এই প্রস্তাব করা কখনই সম্ভবপর নয়।” (১৯৩৮ সালের ৬ই জুন তারিখে সুভাষচন্দ্রকে লেখা জিন্নাহর পত্র)
এরপরে সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালের ২৫শে জুলাই তারিখে জিন্নাহকে একটি পত্র পাঠিয়ে যে প্রশ্ন করেছিলেন, সেটার মর্মার্থ ছিল যে, মুসলিম লীগই যে মুসলমানদের একমাত্র সংগঠন—একথা কংগ্রেসের পক্ষে কিভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব? সুভাষচন্দ্র নিজের এই পত্রে তাঁকে জানিয়েছিলেন—
‘ওয়ার্কিং কমিটি আশা করে যে, লীগ কাউনসিল কংগ্রেসকে অসম্ভব কিছু করতে বলবে না। এটাই কি যথেষ্ট নয় যে, লীগের সঙ্গে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ স্থাপন করতে এবং হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নের মতো বহু বিতর্কিত প্রশ্নের একটি সম্মানজনক মীমাংসায় উপনীত হতে কংগ্রেস কেবলমাত্র ইচ্ছুক নয় আগ্রহীও বটে। এই পর্যায়ে কংগ্রেসের দাবি কি তাও বলে রাখা ভালো। যদিও অগণিত কংগ্রেস সদস্যদের তালিকায় সর্বাধিক নাম যাঁদের তাঁরা হিন্দু—এ কথা মেনে নিলেও বহু সংখ্যক মুসলিম এবং বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী অপরাপর সম্প্রদায়ের লোকেরাও কংগ্রেসের সদস্যভুক্ত। … তবুও ওয়ার্কিং কমিটি আনন্দিত হবে যদি আপনার কাউনসিল কংগ্রেসের সঙ্গে এমন একটা বোঝাপড়ায় আসে যাতে আমরা জাতীয় অখণ্ডতা অর্জন করতে পারি এবং একই ভবিষ্যতের জন্য সর্বান্তকরণে কাজ করে যেতে পারি।’
অন্যদিকে এসময়ে সুভাষচন্দ্র মুসলিম লীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে যত তাড়াতাড়ি একটা সুরাহার পথে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, এর বিপরীতে তাঁর নিজের দলেই কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্রের পায়ের তলা থেকে পাটাতক সরিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত ততই দ্রুতলয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। আর শেষপর্যন্ত এরই ফলস্বরূপ একটা দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়ে সুভাষচন্দ্র যেমন জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের সঙ্গে আর কোন রাজনৈতিক মীমাংসার অবসান ঘটাতে পারেননি, ঠিক তেমনই চক্রান্তেরই শিকার হয়ে দেশে থেকে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ করা সম্ভব নয় ও জেলে পচে মরা ছাড়া তাঁর সামনে কোন অন্য পথ নেই—একথা চিন্তা করে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাই সেদিন যদি সুভাষচন্দ্র ও জিন্নাহর মধ্যে এই রাজনৈতিক মীমাংসা সফল হত, তাহলে হয়ত ভারত ভাগ হত না, সুভাষচন্দ্র দেশ ত্যাগ করতেন না, এবং জিন্নাহই স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু এই কাহিনীতে পৌঁছাবার আগে আরেকটু পিছনের কাহিনীতে যেতে হবে।
স্বাধীনতার আগে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে কংগ্রেসের আপোষকামী দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে প্রগতিশীল ও বামপন্থীদের বিরোধ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। এসময়ে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করবার জন্যই মূলতঃ বামপন্থী ও প্রগতিপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। আর এরই সমর্থনে তখন ১৮ই আগস্ট তারিখে শ্রদ্ধানন্দ পার্কে প্রাদেশিক কিষাণসভা, লেবার পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন ও প্রগতি লেখক সংঘ মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। একইসময়ে এই যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনার বিরোধিতার সঙ্গে সঙ্গে সুভাষচন্দ্রকে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন করাকে কেন্দ্র করেও বিরোধ দানা বেঁধে উঠেছিল; এবং কংগ্রেসের মধ্যে ন্যাশনাল ফ্রন্টই তখন সর্বপ্রথম সুভাষচন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। তারপরে ১৯৩৮ সালের ১৭ই অক্টোবর তারিখে সাজ্জাদ জাহির, জেড. এ. আমেদ, মোহন সিং যশ, ভগৎ সিং, রামমূর্তি, পি. সুন্দরাইয়া, ই. এম. এস. নামুদ্রিপাদ প্রমুখ কংগ্রেস স্যোসিয়ালিস্ট পার্টির সদস্যরা একটি বিবৃতিতে সুভাষচন্দ্রের পুনর্নির্বাচন দাবি করেছিলেন। অতঃপর ঠিক একইভাবে ২২শে অক্টোবর তারিখে হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ হাসান আলী, মোয়াজ্জেম আলী চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, আবুল মনসুর আমেদ, এ. রশিদ খাঁ প্রমুখ মুসলিম নেতারা সুভাষচন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, বামপন্থীরা সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস সভাপতি করতে চান—এই প্রচার দানা বাঁধতেই কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থীরা তখন প্রকাশ্যভাবেই সুভাষচন্দ্রের বিরোধীতায় অবতীর্ন হয়েছিলেন। আর একটি মিলিত বিবৃতিতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, মৌলানা আজাদ ও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনাক্রমেই পট্টভি সীতারামাইয়াকে সেবার মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে; অর্থাৎ—সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি পদের জন্য আর মনোনয়ন পাবেন না। অতঃপর ১৯৩৯ সালের ২৪শে জানুয়ারি তারিখে সুভাষচন্দ্র একটি বিবৃতিতে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জানিয়েছিলেন—
“১৯৩৪ সাল থেকে একজন বামপন্থী কংগ্রেস-সভাপতি হয়ে আসছেন। এই বৎসর যে উক্ত প্রথার পরিবর্তন হচ্ছে ও দক্ষিণপন্থী প্রার্থীকে সভাপতি করার চেষ্টা হচ্ছে, তা নিরর্থক নয়। ... বর্তমান অবস্থায় এমন একজন কংগ্রেস সভাপতির প্রয়োজন, যিনি মনেপ্রাণে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী।”
এরপরে সেদিনই বরদৌলি থেকে সর্দার প্যাটেল, জে. বি. কৃপালনি, ভুলাভাই দেশাই, জয়রাম দাস দৌলতরাম, শংকর রাও দেও, রাজাজী, রাজেন্দ্রপ্রসাদ প্রমুখ বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন—
‘আমরা মনে করি খুব গুরুতর কারণ না ঘটলে বিদায়ী সভাপতিকে পুনরায় নির্বাচন না করার নীতিই অক্ষুণ্ণ রাখা উচিৎ।’
তারপরে নির্বাচন হলে, গান্ধীজির সক্রিয় বিরোধিতা সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র পুনরায় কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৩৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি তারিখে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে সুভাষচন্দ্রের এই জয়লাভ বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছিল। আর ঠিক এর পরদিন—১লা ফেব্রুয়ারি তারিখে সুভাষচন্দ্রের জয়লাভ সম্পর্কে গান্ধীজির সেই ঐতিহাসিক বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে তিনি বলেছিলেন—
‘গোড়া থেকেই আমি তাঁর পুনর্নির্বাচনের বিরোধী ছিলাম। নির্বাচনের প্রচারপত্রে তিনি যেসব তথ্য ও যুক্তি প্রদর্শন করেছেন, তা আমি সমর্থন করি না। মৌলানা সাহেব তাঁর নাম প্রত্যাহার কববার পর আমার চেষ্টাতেই পট্টভি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নি। অতএব এই পরাজয় তাঁর অপেক্ষা আমার বেশি । ... সুতরাং যাঁরা কংগ্রেসে থাকা অস্বস্তিকর বলে মনে করেন, তাঁরা বাইরে চলে যেতে পারেন।’
এভাবেই নির্বাচনী যুদ্ধে সুভাষচন্দ্র ও সীতারামাইয়ার মাঝখানে গান্ধীজি তখন ঢুকে পড়েছিলেন। অন্যদিকে জওহরলাল তখন শান্তিনিকেতনে অবস্থান করছিলেন। তাই ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে সুভাষচন্দ্র জওহরলালের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন। এরপরে ১৩ই ফেব্রুয়ারি তারিখে সুভাষচন্দ্র এলাহাবাদে গিয়ে পুনরায় জওহরলালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, এবং সেদিনই গান্ধীজির পরামর্শ ও নির্দেশ ভিক্ষা করেছিলেন। তবে এই আলোচনায় অবশ্য কোন ফল হয়নি। বরং গান্ধীজি স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে—
‘সর্দার প্যাটেল এবং অন্যান্যরা একই কমিটিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করবেন না।’
তাই শেষপর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হয়ে সুভাষচন্দ্র ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। আর এরপরেই সুভাষচন্দ্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অন্যদিকে ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ওয়ার্ধায় ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডাঃ নীলরতন সরকার প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা সুভাষচন্দ্রকে কোন মতেই ওয়ার্ধায় যাওয়ার অনুমতি না দেওয়ার কারণে তিনি সমস্ত অবস্থা জানিয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভা স্থগিত রাখবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তাঁর এই প্রস্তাবে কোনো ফল হয়নি, আর নির্ধারিত সময়ে সুভাষচন্দ্রের অনুপস্থিতিতে সর্দার প্যাটেল প্রমুখ ১২ জন সদস্য একযোগে ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এরপরে ৭ই মার্চ তারিখে ত্রিপুরী কংগ্রেস শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাই যদিও সুভাষচন্দ্র তখনও অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু তবুও এবারে ডাক্তারদের সমস্ত নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করেই নিজের অসুস্থ শরীরে তিনি ত্রিপুরী যাত্রা করেছিলেন। তবে এবারেও জ্বরের কারণে তিনি ওয়ার্কিং কমিটির সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। শেষপর্যন্ত তিনি বিষয় নির্বাচনী সভায় স্ট্রেচারে করে পৌঁছালে, এদিনই গোবিন্দ বল্লভ পন্থ গান্ধীজির নেতৃত্ব ও অনুসৃত নীতির প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করে তাঁর ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র এসময়ে আপোষ আলোচনার দ্বারা এই প্রস্তাবটিকে সর্বজনগ্রাহ্য করবার অনুরোধ জানালেও তাঁর এই প্রচেষ্টা তখন ব্যর্থ হয়েছিল। আর অবশেষে দু’দিন ধরে আলোচনা চলবার পরে পন্থ প্রস্তাব ২১৮-১৩৫ ভোটে গৃহীত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অসুস্থ সুভাষচন্দ্র এসময়ে প্রকাশ্য অধিবেশনেও থাকতে পারেন নি।
ইতিমধ্যে ইউরোপে মহাযুদ্ধের করাল ছায়া ঘনিয়ে এসেছিল, আর ১৫ই মার্চ তারিখে নাৎসীবাহিনী প্রাগ-নগরী অধিকার করে নিয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, সমকালে ত্রিপুরীতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণে শেঠ গোবিন্দদাস গান্ধীজিকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, ও পাঞ্জাবের একদল প্রতিনিধি—‘মহাত্মাজি কি জয়’ … ‘হিন্দুস্তান কি হিটলার কি জয়’—ধ্বনি তুলেছিলেন।
যাই হোক, এসময়ে কংগ্রেসের অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র প্রস্তাব রেখেছিলেন যে, ছ’মাসের সময় দিয়ে বৃটিশ সরকারকে একটা চরমপত্র দেওয়া হোক। কিন্তু গান্ধীজি এবং নেহরু তখন যুক্তভাবে তাঁর এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করবার ফলে কংগ্রেস সভাপতির নিজের প্রস্তাবই নিজের দলে অগ্রাহ্য হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে এসময়কার কংগ্রেসের অবস্থা বর্ণনা করে সুভাষচন্দ্র নিজেই লিখেছিলেন—
“সভাপতি হইল, দল তাঁহার নেতৃত্ব গ্রহণ করিল না। উপরন্তু দেখা গেল যে, সভাপতির পক্ষে যাহাতে কাজ করা অসম্ভব হয়, ঐ উদ্দেশ্যে গান্ধীদল প্রতিটি ব্যাপারেই তাঁহার বিরোধিতা করিতেছে। তাঁহাকে কংগ্রেস পরিচালনার ক্ষমতা না দিতে গান্ধীদল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল এবং সাক্ষী গোপাল সভাপতিরূপেই তাঁহাকে বরদাস্ত করিত। কাজেই সভাপতিত্ব হইতে পদত্যাগ করা ভিন্ন তাঁহার অন্য কোন বিকল্প ছিল না। ১৯৩৯ সালের ২৯শে এপ্রিল তারিখে লেখক তাহাই করিলেন।” (ভারতের মুক্তি সংগ্রাম, পৃ- ৩৫১)
এছাড়া তখন সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস থেকে বিতাড়ন তথা কংগ্রেস ত্যাগ করতে বাধ্য করবার যে ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র নিজেই জানিয়েছিলেন—
“১৯৩৯ সালের বহু পূর্বেই লেখক নিশ্চিত রূপে বুঝিয়াছিলেন যে অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধের আকারে আন্তর্জাতিক একটা সংকট দেখা দিবে এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ভারতের উচিৎ ঐ সংকটের পুরোপুরি সুযোগ গ্রহণ করা। মিউনিক চুক্তির পর অর্থাৎ ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর হইতে এ বিষয়ে ভারতবাসীদের মধ্যে চেতনা সঞ্চয়ের জন্য তিনি চেষ্টা চালাইয়া আসিয়াছেন এবং বৈদেশিক ঘটনা স্রোতের সহিত তাল রাখিয়া স্বীয় নীতি রূপায়ণে কংগ্রেসকে প্রবৃত্ত করিতে তৎপর হইয়াছেন। এই কাজে প্রতি পদক্ষেপে গান্ধীদল তাঁহাকে বাধা দিয়েছে। কারণ, আসন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী সম্বন্ধে তাঁহার কোন বোধশক্তি ছিল না এবং জাতীয় সংগ্রাম এড়াইয়া বৃটেনের সহিত একটি আপষের জন্য সাগ্রহে তাহারা অপেক্ষা করিতেছিল।
… ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস হইতেই মহাত্মা গান্ধী দৃঢ়তার সহিত বলিয়া আসিতেছিলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় সংগ্রামের কোন প্রশ্ন উঠে না। অপরপক্ষে লেখকের ন্যায় অন্যান্যরা, যাঁহাদের দেশপ্রেম তাঁহাদের অপেক্ষা কম ছিল না, সমান নিশ্চিত ছিল যে, ভিতরে ভিতরে দেশ বিপ্লবের জন্য এত প্রস্তুত পূর্বে কখনও হয় নাই এবং আসন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে ভারতের পক্ষে তাহার মুক্তি অর্জনের এমন সুযোগ আসিবে, মানবসমাজের ইতিহাসে যে সুযোগ কদাচিৎ আসে।” (ভারতের মুক্তি সংগ্রাম, পৃ: ৩৫২-৩৫৩)
আর যথারীতি এই সুযোগ এসেছিল, কিন্তু সুভাষচন্দ্র এই সুযোগকে আর কাজে লাগাতে পারেননি। অবশ্য এর আগেই তিনি মনেপ্রাণে বুঝে গিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক কোন সংকট দেখা দিলে গান্ধীজি এবং গান্ধীপন্থীরা তখন বৃটিশ সরকারকে আক্রমণ করবার জন্য কোন পথ গ্রহণ করবেন। আর এরপরে বাস্তবিকই সুভাষচন্দ্রের এই চিন্তা হুবহু মিলে গিয়েছিল। কারণ, ১৯৩৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর তারিখে বৃটেনের সাথে জার্মানির যুদ্ধ লাগবার পরে ৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে গান্ধীজি লর্ড লিনলিথগোর সঙ্গে দেখা করে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে—
‘ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারত ও বৃটেনের মধ্যে মত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বৃটেনের বিপদের সময়ে ভারতের উচিত তার সঙ্গে সহযোগিতা করা।’
এরপরে তিনি আরো বলেছিলেন—
‘এই যুদ্ধে আমার সহানুভূতি বৃটেন ও ফ্রান্সের দিকে। ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্ট বা ওয়েস্ট মিনিস্টার ধ্বংস হবে এ দৃশ্য আমার সহ্য করা অসম্ভব। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা আমি এখন মোটেই ভাবছি না।’
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, এর আগে ১৮ই জুন তারিখে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন—
‘স্বাধীনতার প্রশ্নে কোন গোঁজামিলের অবকাশ নেই। কোন ভুয়ো প্রতিশ্রুতি নয়, কোন গোঁজামিল নয়, কোন টালবাহানা নয়—একমাত্র লক্ষ্য স্বাধীনতা। সবাই প্রস্তুত হও, লগ্ন আসন্ন। ইউরোপের প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে ভারতের ওপরে বৃটিশের বজ্রমুষ্টি শিথিল হয়ে আসবে। তাই এই গভীর সংকটে বৃটিশের জন্য চোখের জল না ফেলে ভারতবর্ষকে নিজের কথা ভাবতে হবে। ভারতবর্ষকে এক্ষুনি ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানাতে হবে।’
অর্থাৎ—বৃটেনের চরম সংকটে তার ওপরে আঘাত হানো—এটা ছিল সুভাষচন্দ্রের নীতি, আর এর বিপরীতে বিপদে পড়া ইংরেজকে আরও সাহায্য করাই ছিল গান্ধীজির নীতি। তবে তখন এক্ষেত্রে নেহরুর ভূমিকা বোধহয় সবথেকে বিস্ময়কর ছিল। কারণ, এসময়ে বাহ্যতঃ নেহরু সুভাষচন্দ্রের নীতি সমর্থন করেন—এমন একটা ধারণা সবাইকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন, কিন্তু কার্যতঃ তিনি গান্ধীজির মত ও চিন্তারই প্রথম সমর্থক ছিলেন।
আর একারণেই ১৯৩৯ সালে অসুস্থ সুভাষচন্দ্র যখন জামাডোবার জিয়ালগোরায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন সেই অসুস্থ অবস্থাতেই ২৮শে মার্চ তারিখে তিনি জওহরলালকে একটি দীর্ঘ পত্র লিখেছিলেন। তাঁর এই পত্রটিকে আজও ভারতে কংগ্রেসের ইতিহাসের এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এই দীর্ঘ পত্রের শেষে তিনি খুব দুঃখ বেদনার সঙ্গেই জওহরলালকে প্রশ্ন করেছিলেন—
“এবার তোমাকে অনুরোধ করছি তুমি তোমার নীতি ও কার্যক্রম স্পষ্ট কথায় বুঝিয়ে বল। ধোঁয়াটে তত্ত্বকথায় নয়—বাস্তব কাজের কথায়। আমার আরও জানতে ইচ্ছে করে তুমি কী। সোশ্যালিষ্ট? বামপন্থী? মধ্যপন্থী? দক্ষিণপন্থী? না গান্ধীবাদী—না অন্য কিছু?” (কোন পথে!, সুভাষচন্দ্র বসু, পৃ- ১২৭)
ইতিমধ্যে কংগ্রেসের দক্ষিণ ও বামপন্থীদের মধ্যে বিরোধ-সংঘাত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল; আর শেষপর্যন্ত জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় কংগ্রেসের ভবিষ্যত কর্মসূচী থেকে সত্যাগ্রহ ও প্রত্যক্ষ সংগ্রাম অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রাখবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। এছাড়া তখন প্রকাশ্যে কংগ্রেস মন্ত্রীদের সমালোচনা করাও নিষিদ্ধ বলে বলে ঘোষিত হয়েছিল। তখন এর প্রতিবাদে সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে বামপন্থী সমন্বয় কমিটি সারা ভারত প্রতিবাদ দিবস পালনের ডাক দিয়েছিল। অতঃপর ২৫শে জুলাই তারিখে বিপিসিসি–এর (বেঙ্গল প্রভিশনাল কংগ্রেস কমিটি) রিকুইজিশন সভায় পুরোনো কার্যকরী সমিতির জায়গায় নতুন কার্যকরী সমিতি গঠিত করা হলে ১৪৯ জন সদস্যের মধ্যে ২৮ জনকে বাদ দিয়ে নতুন বিপিসিসি গঠিত হয়েছিল। এর প্রতিবাদে সুভাষচন্দ্র তখন জাতীয় সংগ্রাম সপ্তাহ পালনের ডাক দিলে অবশেষে ১২ই আগস্ট তারিখে ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। আর এসময়ে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল—
‘গুরুতর নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবার জন্য শ্রীসুভাষচন্দ্র বসুকে বিপিসিসির সভাপতি পদে অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাস থেকে শ্রীবসু তিন বছরের জন্য কোনও নির্বাচিত কংগ্রেস কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।’
ক্রমে ইতিহাস আরো এগিয়ে গিয়েছিল, আর ১৯৪০ সালে বিশ্ব সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছিল। একইসাথে এসময়ে কংগ্রেসের রাজনীতিতেও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। এসময়ে গান্ধীজি ও অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে চূডান্ত সংঘাতে নামতে দ্বিধাগ্রস্ত এবং উৎসাহহীন—এই বিশ্বাসই সুভাষচন্দ্রের মনে ক্রমেই দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে উঠেছিল। আর তাই ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে রামগড়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনের পাশেই সুভাষচন্দ্র আপোষ-বিবোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছিলেন, এবং এই আপোষ-বিরোধী সম্মেলন থেকেই তিনি তখন জাতীয় সপ্তাহ পালন করবার উদ্দেশ্যে একটি কর্মসূচী প্রচার করেছিলেন। আসলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করা, আর এই সংগ্রামে কংগ্রেসকে যুক্ত করাই তাঁর এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল।
সুভাষচন্দ্র যখন কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মরণপণ লড়াইয়ে প্রবৃত্ত ছিলেন, ঠিক তখনই চিহ্নিত বামপন্থীরা কিন্তু একে একে তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন। এসময়ে প্রথমেই ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কম্যুনিস্ট পার্টি—পি রামমূর্তি ও ই. এম. এস. নাম্বুদ্রিপাদ যে দলের নেতা ছিলেন, তাঁরা সুভাষচন্দ্রকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ সুভাষচন্দ্রকে ত্যাগ করেছিলেন। এমনকি মানবেন্দ্র রায় ও তাঁর অনুগামীরা পর্যন্ত এসময়ে সুভাষচন্দ্রকে সঙ্গ দেননি। এরফলে সুভাষচন্দ্র তাঁর এই ক্ষতি পূরণ করবার উদ্দেশ্যে তখন মুসলমান সম্প্রদায়ের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, অনগ্রসর মুসলমান শ্রেণীকে যদি মুসলীম লীগের রাজনীতির আওতার বাইরে নিয়ে এসে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সামিল করা যায়, তাহলে যেসব সুবিধাবাদী বামপন্থী অথবা আপোষকামী বামপন্থীরা তখন তাঁকে করেছিলেন, সেই রাজনৈতিক ক্ষতি পূরণ হতে পারে।
অন্যদিকে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে রামগড়ে যখন কংগ্রেস এবং সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আপষ বিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ঠিক একইসময়ে লাহোরে মুসলীম লীগের অধিবেশনে ইতিহাস বিখ্যাত লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। আর লাহোর প্রস্তাবই পরবর্তীকালে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে পরিচিত হয়েছিল। সমকালীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে লাহোর অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগ সম্মেলনে এ. কে ফজলুল হক এই প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন। তবে হক সাহেবের রচিত এই প্রস্তাবে তখন অবশ্য ‘পাকিস্তান’ বলে কোনো শব্দের উল্লেখই ছিল না। তবে তখনই এই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল যে, পশ্চিম ভারতের কয়েকটি রাজ্য এবং পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্যকে নিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
এরফলে সুভাষচন্দ্র যখন দেশের মুসলমান সম্প্রদায়কে জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত করবার পরিকল্পনা তৈরি করে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই লাহোর প্রস্তাব, অর্থাৎ—লাহোর অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে পেশ হওয়া পাকিস্তান প্রস্তাব, তাঁর এই পরিকল্পনায় প্রচণ্ডভাবে আঘাত হেনেছিল। কিন্তু সুভাষচন্দ্র তবুও হাল ছাড়েন নি।
এরপরেই এপ্রিল মাসে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তাই তখন সুভাষচন্দ্র কর্পোরেশনের এই নির্বাচনের জন্য কলকাতা মুসলিম লীগের সঙ্গে একটা চুক্তি করে ফেলেছিলেন। এসময়ে তিনি এই চুক্তি সম্পর্কে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ পত্রিকায় তাঁর স্বাক্ষরিত একটি সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন—
‘ভাগ্য যদি অনুকূল হয়, এধরণের বোঝাপড়ার ক্ষেত্র ও প্রয়োগ সম্ভাবনা একদিন এত ব্যাপক হবে যে, এরমধ্যে প্রদেশ ও দেশ সম্পর্কিত অনেক বড় বড় প্রশ্নও থাকবে। মুসলিম লীগের সঙ্গে বর্তমান চুক্তিকে আমরা বিরাট একটি কীর্তি বলে মনে করি, বাস্তবতার দিক থেকে নয়—সম্ভাবনার দিক থেকে। গত তিন বছর ধরে আমরা অন্ধকারে হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছিসাম। কিন্তু সাফল্য লাভ করিনি। প্রতিবারই সাম্প্রদায়িক সংস্কার বিদ্বেষে অনড় এক দেওয়ালে আমরা প্রতিহত হয়েছি এবং আমাদের সব চেষ্টা নিষ্ফল হয়েছে। এই আমরা সেই দেওয়াল ভেদ করতে পেরেছি এবং তার ফাটল দিয়ে আশার আলোক-রশ্মি দেখা যাচ্ছে। এবারে কিছুটা আশা হচ্ছে যে, আমরা হয়তো এমন একটা সমস্যার শেষপর্যন্ত সমাধান করতে পারব যা অনেকের কাছেই প্রায় সমাধানের অতীত বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। সামান্য সূত্রপাত থেকে অনেক সময় বিরাট বিরাট কীর্তির উদ্ভব হয়।’ (কংগ্রেস ও সাম্প্রতিক সংগঠন, ফরওয়ার্ড ব্লকের স্বাক্ষরিত সম্পাদকীয়)
অতঃপর সুভাষচন্দ্রের প্রচেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মৈত্রীতে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীদের জয়জয়কার হয়েছিল। অতীতে এপ্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থের তেরোতম অধ্যায়ের অন্তর্গত ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ নামক প্রবন্ধে লিখেছিলেন—
“১৯৪০ সাল। এপ্রিল মাস। এক বিস্ময়কর ঘটনা। সাবেক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ বাবু কলিকাতা কংগ্রেস ও কলিকাতা মুসলিম লীগের মধ্যে এক চুক্তি ঘটান। সেই চুক্তির ভিত্তিতে তাঁরা কলিকাতা কর্পোরেশনের সাধারণ নির্বাচন করেন। প্রায় সবগুলি আসনই তাঁরা দখল করেন। কিছুদিন আগে হক মন্ত্রিসভা কলিকাতা মিউনিসপ্যাল আইন সংশোধন করিয়া কর্পোরেশনের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করিয়াছিলেন। মোট ৯৩টি নির্বাচিত সীটের মধ্যে ২২টি মুসলমানের জন্য রিজার্ভ করা হইয়াছিল। মহাত্মাজীর সাথে বিরোধ করিয়া কংগ্রেস ত্যাগ করাতেও সুভাষ বাবুর জনপ্রিয় মোটেই কমে নাই, বরঞ্চ বাড়িয়াছে। বস্তুতঃ এই সময়ে সুভাষ বাবু বাংলার তরুণদের একরকম চোখের পুতুলি। আর ওদিকে কলিকাতা মুসলিম লীগও মুসলিম ভোটারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এই দুই পক্ষের মৈত্রী ভোটারদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি করিল। নির্বাচনে জয়জয়কার। মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র হইলেন। স্বয়ং সুভাষ বাবু তাঁর নাম প্রস্তাব করিলেন। মেয়র ছাড়া পাঁচজন ওল্ডারম্যানের মধ্যে দুইজন হন মুসলিম লীগের। এ ছাড়া শর্ত হইল যে, পর্যায়ক্রমে প্রতি তিন বছরে মুসলিম মেয়র হইবেন। মুসলিম লীগের জন্য এটা সুস্পষ্ট বিজয়। কংগ্রেস নেতাদের পক্ষে মুসলিম লীগকে মুসলমানদের প্রতিনিধি-প্রতিষ্ঠান রূপে মানিয়া নেওয়ার এটা প্রথম পদক্ষেপ। অপরদিকে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের এটা পরম পরাজয়। কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপোস করিলে জাতীয়তার আশা থাকিল কই? কাজেই আমরা জাতীয়তাবাদী মুসলিম লীগ-বিরোধী মুসলমানরা সুভাষবাবুর উপর খুব চটিলাম। ডাঃ আর. আহমদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি সুভাষবাবুর এই কার্যের তীব্র নিন্দা করিলাম। খবরের কাগজে এক যুক্ত বিবৃতি দিলাম। সুভাষবাবু এ বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে আমাদেরে চায়ের দাওয়াত দিলেন। সুভাষবাবুর বাড়িতে চায়ের দাওয়াত রাখা আমাদের জন্য নূতন নয়। অধ্যাপক কবির ‘দৈনিক কৃষকে’র ম্যানেজিং ডিরেকটর, ডাঃ আর. আহমদ ডিরেক্টর ও আমি তার এডিটর। সুভাষবাবু ‘কৃষকের’ একজন পৃষ্ঠপোষক। কংগ্রেসের মেম্বর না হইয়াও আমরা তিনজনই কংগ্রেসী রাজনীতিতে সুভাষবাবুর সমর্থক। এ অবস্থায় উক্ত বিবৃতির আলোচনার জন্য আমাদেরে চা খাইতে ডাকিয়া পাঠানো সুভাষবাবুর পক্ষে নূতন কিছু ছিল না। অন্যায় ছিল না। তবু আমার বন্ধুদ্বয় সুভাষবাবুর দাওয়াত রাখিলেন না। এতই গোঁসা হইয়াছিলেন তাঁরা কাজেই আমাকে একাই যাইতে হইল। আমি যথসময়ে সুভাষবাবুর এলগিন রোডস্থ বাসভবনে গেলাম। বন্ধুদ্বয়ের না আসার বানাওট কৈফিয়ৎ দিলাম। সুভাষবাবু মুচকি হাসিলেন। তিনি আসল কারণ বুঝিলেন। আমরা দুইজনে আলাপে বসিলাম। সুভাষবাবু পাক্কা মেহমানদার। আমরা কয়েক তরি মিঠাই ও বহু কাপ চা খাইলাম। আমার জন্য এক টিন সিগারেট আনাইলেন। নিজে তিনি সিগারেট খাইতেন না।”
আবুল মনসুর আহমদের এই বিবৃতি থেকে বোঝা যায় যে, সুভাষচন্দ্রের এই রাজনীতি তখন নানা প্রকারে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। এসময়ে শুধু কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব নয়, বরং জাতীয়তাবাদী অনেক মুসলমান নেতাও সুভাষচন্দ্রের মুসলিম লীগের সঙ্গে এই আপষ করবার চেষ্টাকে ভালচোখে দেখেননি। আর একারণেই ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকার নানা লেখায়, এবং ডঃ আর আমেদ, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর ও আবুল মনসুর আমেদ প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েও সুভাষচন্দ্রের এই কাজের সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে অমৃতবাজার পত্রিকা এবং হিন্দুমহাসভাও তখন সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিল। এপ্রসঙ্গে ১৯৪০ সালের ৪ঠা মে তারিখের ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাক্ষরিত সম্পাদকীয় প্রবন্ধে সুভাষচন্দ্র নিজেই জানিয়েছিলেন—
‘হিন্দুমহাসভা এবং অমৃতবাজার পত্রিকার মত সংবাদপত্রের কৃতিত্ব এই যে, তারা হঠাৎ অত্যুগ্র সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের এবং অন্যত্র হিন্দুদের মন বিষিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দিনের পর দিন সাম্প্রদায়িক বিষোদ্গার করে চলেছে।’
এরপরে নিজের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সুভাষচন্দ্র জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন। আর এসময়ে তিনি প্রথমেই ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আমেদ—যিনি তখন সুভাষচন্দ্রের একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন, তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এসময়ে সুভাষচন্দ্র স্পষ্টভাষায় নিজের মতপ্রকাশ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষ থেকে যদি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, তাহলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে একটা আপোষের মঞ্চে আনবার দরকার রয়েছে। কারণ, কংগ্রেস এবং মুসলমান লীগের রাজনীতি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে চীনের প্রাচীর তৈরি করে ফেলেছে; আর এই প্রাচীর ভাঙবার জন্য যে প্রয়োজনীয় শক্তির দরকার, কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে সেটারই সূচনা ঘটেছে।
এসময়ে আবুল মনসুর আমেদ ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে বৈঠকে যে কথাবার্তা হয়েছিল, সেটার প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ আবুল মনসুর আমেদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ নামক অধ্যায় থেকে তুলে ধরা যেতে পারে, যা নিম্নরূপ—
“আলাপের গোড়াইতে তিনি দুঃখ করিলেন: তাঁর সাথে আলাপ না করিয়া কাগজে বিবৃতি দিলাম কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? জবাবে আমি বলিলাম: আমাদেরে ঘুণাক্ষরে না জানাইয়া মুসলিম লীগের সংগে তিনি আপোস করিলেন কেন? এটা কি বন্ধুর কাজ হইয়াছে? ঝগড়ার সুরে আরম্ভ করিলাম বটে, কিন্তু পর মুহূর্তেই উভয়েই উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলাম। শেয়ানে-শেয়ানে কোলাকুলি। কারণ বিলম্ব এড়াইবার জন্যই উভয়ে পরস্পরকে জানাইয়া যার তার কাজ করিয়াছিলাম। আচ্ছা বেশ। এখন কি করা যায়?
সুভাষবাবু অন্তরের দরদ দিয়া যা বলিলেন, তার মর্ম এই: হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ভারতের মুক্তি নাই। মুসলিম লীগ মুসলিম জনগণের মন জয় করিয়াছে। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দ্বারা কোনও আশা নাই। ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা চীনা দেওয়া উঠিয়া পড়িয়াছে। সে দেওয়ালের জানালা নাই। একটা সুরাখও নাই যার মধ্যে