04/02/2024
দুটি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, ততদিনে তাঁর জীবন থেকে হারিয়েছে তিরিশটা বসন্ত।
তিনি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বঙ্গীয় শব্দকোষ' তাঁকে অমর করেছে। বাংলা ভাষার জন্য রচনা করে গিয়েছেন এক অমূল্য সম্পদ।রবীন্দ্রনাথকে তিনি গুরুদক্ষিনা দিয়েছিলেন ।
হরিচরণ কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন 'আমাদের বাংলা ভাষায় কোনও অভিধান নেই, তোমাকে একখানি অভিধান লিখতে হবে।'শব্দ আর তার অর্থের সন্ধান খুঁজতে তারপর থেকে হরিচরণের জীবনে দিন-রাত সব এক হয়ে গেলো৷প্রায় কুড়ি বছরের নিরলস পরিশ্রমে পাণ্ডুলিপি তৈরি হল৷ শেষ পর্যন্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুদক্ষিনা দিয়েছিলেন । জীবনে অনেক কিছু হারালেও সেসবে তাঁর বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিল না,বরং তিনি বলতেন 'গুরুদেবের নির্দিষ্ট কাজে চোখ দু’টো উৎসর্গ করতে পেরেছি, এটাই পরম সান্ত্বনা'৷
হরিচরণের প্রায় কুড়ি বছরের নিরলস পরিশ্রমে
পাণ্ডুলিপি তৈরি হল৷ কিন্তু পরের দশটা বছর পাণ্ডুলিপি পড়ে রইল। ছাপার মুখ দেখল না,ততদিনে তিনি দ্বিতীয়বার পুরো অভিধানটি সংশোধন সেরে ফেলেছেন।
'বঙ্গীয় শব্দকোষ' রচনার থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশের সময়ের মাঝের অংশের বেদনাবিধুর গল্প বোধহয় যেকোনও পাঠকের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় নেমে আসবে বারিধারা৷অভিধান রচনা করতে গিয়ে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় হারিয়েছেন দু'চোখের দৃষ্টি,বই প্রকাশ করার সময় অর্থাভাবে সব দিকের দরজা যখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম,তখন জীবনের সব সঞ্চয় উজাড় করে দিয়েছেন৷
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কুলের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই৷ তখন তিন টাকা বেতন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে৷কিন্তু সেই টাকা কিভাবে জোগাড় হবে!এক বন্ধু বলেছিল পটলডাঙার মল্লিকবাবুরা কয়েক জন ছাত্রের বেতন দেন।দরখাস্তের সঙ্গে দু’টি সুপারিশ পত্র ছিল৷বিখ্যাত চিকিৎসক চন্দ্রমোহন ঘোষের সুপারিশ খারিজ করে দিয়েছিলেন জাঁদরেল মানুষ,ইন্ডিয়ান মিরর’-এর সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ সেন।কিন্তু তাঁর জন্য দ্বিতীয় সুপারিশ পত্রটি যে পাঠিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ আর সমস্যায় পড়তে হয় নি।
হরিচরণ-কবিগুরুর এমন স্নেহের সম্পর্কের আসল অনুঘটক হলেন পিসতুতো দাদা যদুনাথ চট্টোপাধ্যায়৷ দাদা খবর দিলেন বাবুদের বাড়িতে নাটক হবে। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। অভিনয় করবেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷সেই নাটক দেখার জন্য যদুনাথের কিশোর ভাইয়ের মনে প্রবল উত্তেজনা তেমন অনির্বচনীয় আনন্দ সেই নাটক তিনি দেখেছিলেন৷প্রবীন বয়সেও দস্যুবেশী রবীন্দ্রনাথের ছবি, নাটক দেখার স্মৃতি জীবনের মনিকোঠায় জ্বলজ্বল করত৷
আচমকা শান্তিনিকেতন থেকে একটি বার্তা এসেছিল পতিসরের ম্যানেজার শৈলেশচন্দ্র মজুমদারের কাছে।
বার্তা পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর কর্মচারী? তিনি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন দিনের বেলা না হয় সেরাস্তায় কাজ করে,কিন্তু রাতের অবসরে সে কি করে,কবির প্রশ্নের উত্তরে হরিচরণ বলেছিলেন ‘কিছুক্ষণ সংস্কৃতের আলোচনা করি ও কিছুক্ষণ একখানি বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখে প্রেসের কপি প্রস্তুত করি।’ কবি পাণ্ডুলিপি দেখতে চাইলেন। তার পরেই এসেছিল শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বার্তা৷
হরিচরণের পান্ডিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল প্রবল আস্থা।
রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিপাঠীকে লিখলেন, ‘এ গ্রন্থখানি রচিত ও প্রকাশিত হইলে দেশের একটি মহৎ অভাব দূর হইবে।’ রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বভারতী থেকেই প্রকাশ হবে ওই মহাগ্রন্থ৷তিনি দায়িত্ব দিলেন বিধুশেখর শাস্ত্রী ও ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে।কিন্তু বই ছাপার জন্য যে টাকার প্রয়োজন বিশ্বভারতীর তখন সেটার অভাব৷
সুনীতিকুমার শরণাপন্ন হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের৷কিন্তু সেখান থেকে বলা হল বই ছাপার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে৷ দুঃশ্চিন্তার গভীর মেঘ তখন যেন ছেয়ে আছে শান্তিনিকেতনে৷অথচ হরিচরণ নাছোড়। বইপ্রকাশের আলোচনা হচ্ছে মাঝে-মাঝে, কে থাকছেন না,রবীন্দ্রনাথ,রথীন্দ্রনাথ থেকে সুনীতিকুমার সবাই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন কিন্তু সমাধানসুত্র অধরা৷
হরিচরণ নিজের মত করে চেষ্টা শুরু করলেন,তাঁর গুরুদেবের আদেশে তৈরি অভিধানকে যে প্রকাশের আলো দেখাতেই হবে৷ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে গিয়েও সমস্যার সুরাহা হল না৷এরই মাঝে কেটে গেল দীর্ঘ প্রায় দশ বছর৷ এই সময় হরিচরণ অবশ্য দ্বিতীয়বার অভিধানটি সংশোধন করলেন৷অবশেষে অভিধানের প্রকাশক পাওয়া গেল৷'বিশ্বকোষ’-এর নগেন্দ্রনাথ বসু বললেন তিনি অভিধান প্রকাশ করবেন,কিন্তু শর্ত কাগজের দামটা তাঁকে মেটাতে হবে,ছাপার খরচ তিনি পরে নেবেন৷
অভিধান প্রকাশের জন্য জীবনের সব সঞ্চয় ব্যয় করতে এতটুকু ভাবলেন না হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ একে একে তেরো বছর ধরে প্রকাশিত হল মোট একশো পাঁচটি খণ্ড।হরিচরণের প্রয়ানের পর ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে দু’খণ্ডে গোটা অভিধানটি প্রকাশ করে সাহিত্য অ্যাকাডেমি৷
বাংলা ভাষার সর্বোৎকৃষ্ট অভিধান 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' এর রচয়িতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধায় বাংলা ভাষার অমূল্য সম্পদ৷ সৃষ্টি করে নিজেই অমর হয়ে আছেন। আমরা তাঁকে স্মরণ করি,শ্রদ্ধায়।
তথ্যঋণ কৃতজ্ঞতা স্বীকার - আনন্দবাজার পত্রিকায়
অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিবন্ধ
সংগৃহীত✍️